সংবাদ শিরোনাম:

বাড়ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার, ধরতে হচ্ছে পরিবারের হাল

Facebook
LinkedIn
WhatsApp
Email
Print

নিজস্ব প্রতিনিধি:

পরিবারে আর্থিক সংকট, তাই স্নাতক প্রথম বর্ষের পরই লেখাপড়ায় ইতি টানেন মো. মহিউদ্দিন মোহন। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। তিন ভাইবোন আর মাকে নিয়ে তার বেড়ে ওঠা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মা পড়াশোনার খরচ চালান। বয়সের কারণে তিনি (মা) অসুস্থ হওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতকে ওঠা পর্যন্ত টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন মোহন। কিন্তু স্নাতক পর্যায়ের খরচ, সঙ্গে পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।
মোহন বলেন, ‘ইচ্ছে ছিল যেমন করেই হোক অন্তত স্নাতকটা শেষ করবো। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে পড়াশোনা করাটাই বিলাসিতা। স্নাতক শেষ করা তো বহুদূর। তবু গত ১০ বছর আমি চেষ্টা করেছি লেখাপড়া শেষ করার, কিন্তু সম্ভব হয়নি।’
মোহন বলেন, ‘আমি এখন একটা বেসরকারি ব্যাংকের ব্রাঞ্চে ১০ হাজার টাকা বেতনে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছি। এর আগে সরকারি জবের জন্য অনেক জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছি‌। ভাইভাও দিয়েছি, কিন্তু চাকরি হয়নি। ১০-১২ লাখ টাকা চায় চাকরির জন্য। আমার যদি এত টাকা থাকতো, তাহলে তো আমি নিজেই ব্যবসা-বাণিজ্য করতাম। পড়াশোনা কি আর ছাড়তাম? মায়ের ওষুধ, পরিবারের ভরণ-পোষণ, ভাইবোনদের দায়িত্ব, সবকিছু এখন আমার ওপর। এই স্বল্প টাকায় পরিবার চালাতে হয়। করোনার সময় খুব হিমশিম খেয়েছি। এজন্য পড়াশোনা না ছেড়ে কোনও উপায় ছিল না।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোহনের মতো এমন আরও অসংখ্য শিক্ষার্থী অসচ্ছলতাসহ নানা কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। গত মার্চে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালে শিক্ষা শেষ না করে ৫-২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর লেখাপড়া ছাড়ার হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১০ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালে সেই হার এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে। অর্থাৎ গত চার বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে তিন গুণের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষ করেনি।
বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩-এর এই প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য ৩ লাখ ৮ হাজার ৩২টি পরিবারের ওপরে সমীক্ষা চালানো হয়েছে।
বিবিএসের এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার এক ধাক্কায় ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে লেখাপড়া ছাড়ার হার বেড়ে ২০২১ সালে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ০৬ শতাংশে। ২০২২ সালে সেই হার ছিল ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
ওই প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে লেখাপড়া করছিল ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর ২৯ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল লেখাপড়ার বাইরে। কিন্তু ২০২৩ সালে ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে লেখাপড়ার বাইরে চলে আসে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। শিক্ষার্থীর হার কেবল ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সেভ দ্য চিলড্রেনসহ শিশুদের নিয়ে কাজ করা ছয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা রাজধানীতে শিশু অধিকার বিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলেছে, আর্থিক অভাব-অনটন, বাল্যবিবাহ এবং নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে মাধ্যমিক পর্যায়েই ৪১ ভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী এবং ৩৩ ভাগ ছেলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লেখাপড়া ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা বা দুরবস্থা। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শিশু বয়সেই পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক অসচ্ছলতা সবচেয়ে বড় কারণ। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে, পারিবারিক রক্ষণশীলতা বা কুসংস্কার। ছেলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ছাড়ার কারণ আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া এবং বন্ধুবান্ধবের বাজে সঙ্গ। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন কারণও রয়েছে। অনেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে সরকারি বিভিন্ন গ্রেডের চাকরি বা বিভিন্ন বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। আবার অনেকে বেসরকারি চাকরি বেছে নিয়েছেন। যার কারণে পড়াশোনা শেষ করেননি।
আবার কয়েকজন জানান, উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতক পর্যায়ে এসে তাদের লেখাপড়া ছাড়ার অন্যতম কারণ ছিল চাকরির অনিশ্চয়তা ও সেশনজট।‌
উচ্চ মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা ছেড়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন আসিফ (২৪)। তিনি বলেন, ‘আমার জেঠাতো ভাই অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে বেকার থেকে অবশেষে একটা ছোটখাটো ব্যবসা করছেন। এজন্য আমার বাবা আমাকে ইন্টারমিডিয়েট শেষেই চাকরি খোঁজার কথা বলেন। আমি সেনাবাহিনীতে দাঁড়ানোর পর টিকে যাই। তখন সবকিছু বাদ দিয়ে সেনাবাহিনীতে চাকরি করি। এজন্য আর লেখাপড়া শেষ করা হয়নি।’
লেখাপড়া ছাড়ার কারণ হিসেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘কয়েক বছর আগে অনার্স পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে নিতো। তবে নতুন কারিকুলামের কারণে টিউশনি কমে যাচ্ছে পরীক্ষা নেই বলে। খুব সচেতন অভিভাবক ছাড়া কেউ বাচ্চাদের জন্য টিচার রাখে না। এতে যারা নিজেদের খরচ নিজেরা চালাতো, তাদের এখন পড়ালেখা চালানো মুশকিল হচ্ছে। এতে অনেকে বিভিন্ন ধরনের পার্টটাইম জব করছে। একটা সময় দেখা যাচ্ছে, এই জবটাই দিনশেষে পার্মানেন্ট করে ফেলছে। আবার কেউ বা দেখা গেছে উদ্যোক্তা হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাকরির বাজার এখন খুব কঠিন। বাংলাদেশে এখন কেবল বিসিএস দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা। আর সবকিছুতেই দুর্নীতি আছে। ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। দিনশেষে দেখা যায়, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চাকরি জোটে না। তাই অনেকে উদ্যোক্তা হন। এখন অনার্স শেষে যদি উদ্যোক্তাই হতে হয় তাহলে আর এত বছর অপেক্ষা করা কেন? তাহলে কি পড়াশোনা শেষ না করেই উদ্যোক্তা হওয়া ঠিক নয়?’
শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে পড়ালেখা ছাড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজির হোসেন বলেন, ‘প্রথমত দেশে চাকরির সংকট। তারপর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে স্মার্ট স্যালারি আশা করা বোকামি। দেখা যায়, একজন ইন্টারমিডিয়েট পাস ছেলে যে বেতনে চাকরি করছে, অনার্স শেষ হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীকে সেই বেতনের চাকরি করা লাগছে। তাহলে অনার্স শেষ করে কী লাভটা হচ্ছে?’
শিক্ষাজীবন শেষ না করা বেশ কয়েকজন বলেন, সবার স্বপ্ন বিসিএস না, সবার দ্বারা বিসিএস হবেও না। নিম্নবিত্ত পরিবারে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন কেবল একটা সরকারি চাকরি। এখন দেশে দশম থেকে আরও নিচের গ্রেডের বেশিরভাগ চাকরি হয় দুর্নীতির মাধ্যমে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ১০-১২ লাখ টাকা দিয়েও চাকরি পেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে নাম আসে প্রাইমারির প্রশ্ন ফাঁসের। লাখ লাখ টাকা দিয়ে সরকারি চাকরির সামর্থ্যও সবার নেই। তাই অনেকে লেখাপড়া বন্ধ করে বা পড়াশোনা করতে করতেই চাকরি খুঁজছে।
বিবিএসের এই প্রতিবেদন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপমহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমি এসেছি এক সপ্তাহ হবে। এ সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারবো না। এই প্রতিবেদন যারা তৈরি করেছেন বা যে প্রকল্পের আওতায় তৈরি হয়েছে, তারা ভালো বলতে পারবেন।’
বিবিএসের এই প্রতিবেদন সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ উইংয়ের উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনালি ইয়াং এজ শুরু হয় ২৪ থেকে। এখানে অবশ্য দুইটা পার্ট আছে। এক ইয়াং এজ শুরু হয় ১৫ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত। আরেকটা ২৫ থেকে শুরু হয়। আমাদের দেশে সাধারণত একজন শিক্ষার্থী ২৪ বছরে মাস্টার্স শেষ করে। এজন্য আমরা ৫ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করেছি।’
এই প্রতিবেদনে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা স্নাতক পর্যায়ে এসে কত শতাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছাড়ে, তার কোনও বিস্তারিত উল্লেখ নেই কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এটা করিনি কারণ ডিমান্ডের তো শেষ নেই। আপনি এটা বলছেন, আরেকজন এসে বলবে মাদ্রাসারটা আলাদা করে দেন, স্কুলেরটা আলাদা করে দেন, আরেকজন বলবে বয়সভিত্তিক দেন। চাওয়ার তো আর শেষ নেই। এজন্য আমরা শুধু জাতীয়ভাবে করেছি। এখন কারও যদি আলাদাভাবে কোনও চাহিদা থাকে তাহলে সেটা দেখা যাবে। আমরা এখনও মূল প্রতিবেদন প্রকাশ করিনি। এমন কিছুর যদি ডিমান্ড থাকে তাহলে সেটা পরবর্তী সময়ে আপডেট করা হবে। তাছাড়া আমাদের এই প্রতিবেদনে তো এডুকেশন ফোকাস করে করা হয়নি, এটা ডেমোগ্রাফি ফোকাসড। এজন্য ডেমোগ্রাফি বেশি দেই, আর সাপোর্টিংগুলো একটু কম দেই।’
শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে লেখাপড়া ছাড়ার কী কী কারণ, এমন প্রশ্নের জবাবে বিবিএসের উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহটা আগের তুলনায় কমছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে কিন্তু কর্মমুখী বলা যাবে না। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হয়েছে অনেক বেশি। এজন্য এখন মানুষ চিন্তা করছে লেখাপড়া শেখার চেয়ে আমি যদি শুরুতেই একটা কর্মমুখী কিছুতে চলে যেতে পারি সেটাই ভালো। কারণ এখন মাস্টার্স শেষ করেও চাকরি পায় না, চাকরি নেই বাজারে। এজন্য মানুষের মাঝে শিক্ষার প্রতি একটা অনীহার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না কর্মমুখী বানাতে পারছি, ততক্ষণ এ ধরনের রিস্ক থেকে যাবে।’

Facebook
LinkedIn
WhatsApp
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *