সোমবার, ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, বসন্তকাল | ২৩শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
সোমবার, ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৩শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে হিন্দি সিনেমা: ডাবিংয়ের আবদার, গণ্ডগোলের আভাস

Facebook
LinkedIn
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print

বিনোদন ডেস্ক:

ঢালিউড তার স্বাবলম্বী অবস্থা হারিয়েছে বহু দিন আগে। দেশজুড়ে সিনেমার যে জোয়ার ছিল, তা শুকিয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার প্রেক্ষাগৃহ থেকে কমতে কমতে নেমেছে দুই অংকে। এমন ঘোর অমানিশায় হিন্দি ছবিকেই মশাল মনে করছিলেন হল মালিকরা। তাই রীতিমতো আন্দোলনে নেমে দাবি জানান, হিন্দি ছবি আমদানি না করলে হলের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেবেন তারা।
এরপর দফায় দফায় বৈঠক, আলোচনা হলো। সিনেমা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও বিষয়টিতে সায় দিলো। অগত্যা বলিউড তথা ভারতের ছবির জন্য দেশের কাঁটাতার খুলে দেয় সরকার। গত বছরের ১০ এপ্রিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুই বছরের অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর ভারতীয় ছবির বাংলা সফর শুরু হয় সে বছরের ১২ মে; তৎকালীন প্রায় চার মাস পুরনো ছবি ‘পাঠান’ দিয়ে। শাহরুখ খান অভিনীত ছবিটি দেশের দর্শকের সাড়া পায় বেশ। এরপর এক এক করে দেশের পর্দায় উঠেছে বলিউডের ‘কিসি কা ভাই কিসি কি জান’, ‘জাওয়ান’, ‘অ্যানিমেল’ ছবিগুলো। কম-বেশি সাড়া পেয়েছে সবগুলো ছবি। এরমধ্যে ‘ফাইটার’ ছবিটি ছাড়পত্র পেলেও হল পর্যন্ত তুলতে পারেননি আমদানিকারক, কারণ শুরু হয়ে গেছে ভাষার মাস।

আমদানির যুক্তি
হিন্দি ছবি আমদানির মূল কারিগর নির্মাতা ও পরিবেশক অনন্য মামুন। তিনিই তোড়জোড় করে এ বন্দোবস্ত করেছেন। তার মতে, আমদানি শুরুর পর থেকে দেশে হলের সংখ্যা বাড়ছে। বললেন, ‘গত এক বছরে বেশ কয়েকটা হল চালু হয়েছে। এইতো গত সপ্তাহেও নারায়ণগঞ্জে একটা সিনেপ্লেক্স চালু হয়েছে। দেখুন, আমি বলছি না, সিনেমা আমদানি স্থায়ী সমাধান। কিন্তু যখন আমাদের কোনও পণ্য পেঁয়াজ বা আলুর মজুত শেষ হয়ে যায়, তখন আমরা প্রয়োজনের খাতিরে আমদানি করি। পরে আবার নিজেদের উৎপাদন হলে আমদানি বন্ধ করে দেই। এটাও তেমন সিম্পল ব্যাপার। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে আপনি দর্শককে বলে দিতে পারেন না, সে কী দেখবে।’
অনেকের অভিযোগ, দেশের ছবি ডিঙিয়ে হিন্দি ছবিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ অভিযোগ মানতে নারাজ মামুন। তার ব্যাখ্যা এরকম, ‘এক বছরে ছবি এলো মাত্র পাঁচটা। অন্যদিকে দেশের ছবি মুক্তি পেলো প্রায় পঞ্চাশটি। তাহলে দেশের ছবি কি প্রাধান্য পায়নি? আরেকটা কথা হলো, ঈদ ছাড়া দেশের যে’কটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, সেগুলোর কোনোটা কি ন্যূনতম হলের বিদ্যুৎ বিল তুলতে পেরেছে? যদি পেরে থাকে, তাহলে এই কথা মানতে রাজি। অন্যথায় না। একটা ব্যাপার খেয়াল করুন, হিন্দি ছবি আমদানি গত ৬০ বছর ধরে বন্ধ ছিল। এরপরও কীভাবে আমাদের সিনেমা হলের সংখ্যা দেড় হাজার থেকে কমে একশ’র নিচে চলে এলো? আর সরকার তো নিয়ম করেই দিয়েছে, ঈদ-পূজা উৎসবে হিন্দি ছবি মুক্তি দেওয়া যাবে না। আমি চাই, এই নিয়ম মেনে ছবি আসুক। কারণ হলগুলো টিকে থাকতে হলে কনটেন্ট লাগবে।’

একই সুর প্রদর্শক সমিতির
টিকে থাকার জন্য হিন্দি ছবি প্রয়োজন, এ মর্মে মরিয়া হয়ে উঠেছিল হল মালিক তথা প্রদর্শক সমিতি। সংবাদ সম্মেলন করে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়েছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। কয়েকটি ছবি আমদানির পর এখন তাদের মনভাবনা কেমন? জবাব দিলেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে কয়েকটা হল চালু হয়েছে। সুতরাং একটা ইতিবাচক প্রভাব তো পড়ছে। এভাবে চললে আশা করি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক সমাগমের জৌলুস আবার ফিরে আসবে।’
আমদানির প্রয়োজনীয়তা কিংবা দেশের ছবি অগ্রাহ্যের বিষয়টি তুলতেই তার স্পষ্ট জবাব, “হিন্দি ছবি তো প্রতি সপ্তাহে আসছে না। সব ছবি আমদানিও করা হচ্ছে না। কেবল যে’কটা ছবি ভারতে ভালো চলে, সেগুলো আনা হচ্ছে। বাকি সময়টা তো দেশের ছবিই চলছে। মূল কথা হলো, দেশের ছবি দর্শক দেখলে তো অন্য ছবি হল মালিকরাই চালাবে না। এই যেমন ‘হাওয়া’, ‘পরাণ’ কিংবা ‘প্রিয়তমা’ ছবিগুলো চলেছে। তো এরকম ছবি আসুক। হল মালিকদের প্রয়োজন দর্শক; সেটা যে ছবি দিয়ে হোক। তবে আমরা চাই দেশে ভালো ভালো ছবি হোক। আর সেই সঙ্গে হলগুলো টিকে থাকার জন্য হিন্দি ছবিও আসুক।”

এবার ডাবিং আবদার
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহ মধুমিতা। এ হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ মনে করেন, হিন্দি ছবিগুলো কেবল সিনেপ্লেক্সে ভালো চলেছে। সিঙ্গেল স্ক্রিনে সেরকম দর্শক টানছে না। তার ভাষ্য, ‘প্রায় এক বছর হয়ে গেলো ছবি কিন্তু এসেছে মাত্র চারটি। এগুলো সিনেপ্লেক্সে বেশ ভালো ব্যবসা করেছে। হ্যাঁ, গ্রাম অঞ্চলে দর্শক হয়ত তেমন দেখেনি। এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, হিন্দির পাশাপাশি বাংলায় ডাবিং করে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দর্শক আরও আগ্রহী হবে।’
কনটেন্টের অভাবের কথা জানিয়ে নওশাদ বলেন, “এই যে আমার হল এ সপ্তাহে (২ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি) বন্ধ যাচ্ছে। কেন? কারণ ছবি নেই। কী চালাবো? গত বছর শাকিব খানের ‘প্রিয়তমা’ ছবিটা খুবই ভালো ব্যবসা করেছে। সেজন্য আমি হলের সংস্কার করেছি। উন্নত সাউন্ড সিস্টেম সংযোজন করেছি। আগামীতে নতুন স্ক্রিনও যুক্ত করবো। আমি চাই সব দেশের, সব ভাষার সিনেমা উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। আমাদেরকে বাঁচান। ঢাকায় আগে কতগুলো হল ছিল। এখন মাত্র চারটা সিঙ্গেল স্ক্রিন টিকে আছে। সরকার প্রেক্ষাগৃহের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সেই ঋণ নিয়ে কী করবো আমরা? চালানোর মতো ছবি কোথায়? তার চেয়ে বরং এই টাকা ভালো প্রযোজক-নির্মাতাদের দেওয়া হোক। ভালো ছবি হলে মানুষ ভাঙা প্রেক্ষাগৃহে বসেও দেখে।”

বিপরীতে ভিন্ন সুর
এটুকু অস্বীকারের উপায় নেই, হিন্দি ছবিগুলো সিনেপ্লেক্স তথা ভালো মানের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা করেছে। তবে এর কৃতিত্ব নিজেদের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যকে দিতে চান দেশের বৃহত্তম মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আমরা কিন্তু হল মালিকদের ওই আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। স্টার সিনেপ্লেক্স বরাবরই আলাদাভাবে কাজ করে আসছে এবং নিজেদের একটা দর্শক তৈরি করে নিয়েছে। আমরা কিন্তু হিন্দি ছবি আমদানির আগে থেকেই হল সংখ্যা বাড়িয়ে যাচ্ছি। তবে হ্যাঁ, এটাও সত্য যে, দু’একটা হিন্দি ছবিতে প্রচুর দর্শক হয়েছে। আসলে দর্শক তো ভ্যারিয়েশন চায়। কেউ অ্যানিমেটেড ছবি দেখতে পছন্দ করেন, কেউ অ্যাকশন, কেউ সায়েন্স ফিকশন, কেউ রোম্যান্টিক; আমরা তাই সব ধরনের ছবিই চালানোর চেষ্টা করছি।’
সিঙ্গেল স্ক্রিনে দর্শক সমাগমের বিষয়ে বিপরীত তীর ছুঁড়লেন মেসবাহ। তার ভাষ্য, ‘আমি নিজেও কয়েকটি এলাকায় যাওয়ার সুবাদে দেখেছি, সিঙ্গেল স্ক্রিনে বেশ ভালো দর্শক সমাগম হচ্ছে। আর আগে কিন্তু ঈদ ছাড়া হলগুলো বন্ধ থাকতো। এবার সেটা হয়নি। বছরজুড়েই হল চালু ছিল। সেটা কীভাবে? কর্তৃপক্ষ কিছু রিটার্ন পাচ্ছেন বলেই নিশ্চয় চালু রেখেছেন।’

প্রযোজকদের পর্যালোচনা
এই মুহূর্তে দেশে প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির কার্যকর কোনও কমিটি নেই। নানা জটিলতায় সংগঠনটি আপাতত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। তাই হিন্দি ছবির বিষয়ে এ সংগঠনের সর্বশেষ নির্বাচিত সভাপতি, প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুর মন্তব্য নেওয়া হলো। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা ছবি তো এসেছে। এখন আমাদের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আসলে হিন্দি ছবি আমদানিতে আমাদের ভালো কিছু হচ্ছে কিনা। আমরা দেখেছি, হিন্দি ছবিগুলো শুধু সিনেপ্লেক্সেই ভালো চলছে। কিন্তু সিঙ্গেল স্ক্রিনে দর্শক একেবারেই হচ্ছে না। আমদানির জন্য সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছিলেন হল মালিকরা। কিন্তু তারা তো আদতে উপকৃত হননি। সুতরাং এখন আমাদের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আবার বসে আলোচনা করা প্রয়োজন। আমরা এই আমদানি দীর্ঘ করবো নাকি অন্য কোনও চিন্তা-পরিকল্পনা করা দরকার, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

সমতার লড়াই চান নির্মাতারা
অনেকেই মনে করেন, বলিউডের মতো প্রভাবশালী ইন্ডাস্ট্রির ছবির সঙ্গে টক্কর দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না ঢালিউডের ছবি। বিষয়টি মানেন দেশের এই মুহূর্তের সবচেয়ে সফল নির্মাতা রায়হান রাফী। তিনি বললেন, ‘তারা ছবি বানায় ১০০-২০০ কোটি বাজেটে। আমাদের ছবির বাজেট এখনও ২-৩ কোটিতে। ফলে তাদের ছবির সঙ্গে লড়াই করা তো সাজে না। লড়াই হয় সমানে-সমানে। আর আমি বিশ্বাস করি, কোনও ইন্ডাস্ট্রি ভাড়া করা ছবি দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। সাময়িক কিছু দর্শক হয়ত পাওয়া যায়। কিন্তু স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে হলে নিজস্ব কনটেন্ট জরুরি।’
রাফী জানান, দেশের প্রেক্ষাগৃহে তিনি হিন্দি ছবি দেখেননি। তাই এগুলো কেমন সাড়া পেয়েছে, সেটা সম্পর্কেও তেমন অবগত নন। তাই আগামীতে হিন্দি ছবি আমদানি জারি রাখা উচিত হবে কিনা, হলেও সেটা কীভাবে, তা ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠজন ও নীতি-নির্ধারকদের ওপর ছেড়ে দিলেন ‘পরাণ’ নির্মাতা।
তবে নিজের টুকরো ভাবনা জানালেন এভাবে, ‘একজন স্বাধীন নির্মাতা হিসেবে আমি সব নির্মাতাকেই স্বাগত জানাবো। বিদেশি ছবি আমদানিতে আমার জোরালো আপত্তি নেই। তবে আমি চাই একটা সুন্দর নিয়ম থাকুক। প্রদর্শনীতে আমাদের দেশের ছবিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এমনও দেখেছি, হিন্দি ছবির জন্য হল-শো পাচ্ছে না দেশি ছবিগুলো। এটা দেখে আমার ভীষণ খারাপ লেগেছে। আমরা তো চাইলেই ভারতে বা অন্য কোনও দেশে ছবি মুক্তি দিতে পারি না। যথাযথ নিয়ম মেনে, তাদের নিজস্ব ছবিকে প্রাধান্য দিয়েই আমাদের জায়গা পেতে হয়। সুতরাং আমাদের ক্ষেত্রেও এরকম কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা উচিত।’
দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি ছবির সংখ্যা আরও একটি বাড়তে গিয়েও বাড়েনি। গত ২৫ জানুয়ারি ভারতের সঙ্গে একই দিনে ‘ফাইটার’ মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। মিলেছিল তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও। তবে শেষ মুহূর্তে চলচ্চিত্রের ১৯ সংগঠনের জোট ‘চলচ্চিত্র পরিবার’র আপত্তির কারণে ভাষার মাসের কথা বিবেচনায় রেখে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয়নি। গতবছর ঠিক এই পরিবারের অনুরোধে ভারতীয় ছবি দেশে মুক্তির ছাড়পত্র দেয় মন্ত্রণালয়।
একদিকে পৃথিবী এখন মুক্ত; মানুষ তা-ই গ্রহণ করছে, যা তার পছন্দ হচ্ছে। ফলে তাকে গণ্ডিবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। অন্য দিকে দেশের ইন্ডাস্ট্রির কথা ভেবে হিন্দি ছবির বিরোধিতা করছেন কেউ কেউ। অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই সেই যুক্তিও। ফলে হিন্দি ছবি আমদানি ঢালিউডের জন্য নতুন পথ নাকি অদৃশ্য খাদ, এ প্রশ্নের উত্তর সহসাই মিলছে না। তবে প্রায় সকল অংশীদারের সঙ্গে আলাপে এটুকু স্পষ্ট, ভারতীয় ছবি আমদানি নিয়ে সহসা সম্মিলিত সুরাহা হচ্ছে না; বরং ফের পক্ষে-বিপক্ষে গণ্ডগোল বাঁধার আভাস মিলছে ক্রমশ!

Facebook
LinkedIn
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন দিন